মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন -`
পৃথিবীতে যুগে যুগে এমন কিছু আলেম-উলামা ও আউলিয়া কেরাম জন্ম নিয়েছেন, যাদের জ্ঞানভাণ্ডার ও কর্মকাণ্ড মুসলমানদেরকে সমৃদ্ধ ও মহিমান্বিত করেছে। ইতিহাসে এমন অনেক লোকের সন্ধান পাওয়া যায়, পৃথিবী থেকে চলে গেলেও এখনো তাঁরা জীবিত। সেসব স্বরণীয় ব্যক্তিদের অন্যতম প্রাণপুরুষ হলেন আলেম সমাজের মধ্যমণি ও বহুমুখী প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব মাওলানা মুহাম্মদ ফখর উদ্দীন (রহঃ)। তিনি ১৯৪৯ সালের ১ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ পৌরসভা এলাকার মাওলানা মঞ্জিলের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুফতি শফিউর রহমান (রহঃ)। তিনি "মুফতি সাহেব" নামে সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি নিজ এলাকা চন্দনাইশে হাশিমপুর মকবুলিয়া সিনিয়ার মাদ্রাসা এবং জোয়ারা ইসলমিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ পদে ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সহিত নিবিড়ভাবে দায়িত্ব পালন করেন।, মাতার নাম আসমা খাতুন, দাদার নাম সৈয়্যদ হাসান মিয়াজি। মাওলানা ফখর উদ্দীন (রহঃ) তাঁর পিতার ৯ ছেলের ৩য় পুত্র। তাঁর বংশ পরিক্রমা হল-মুহাম্মদ ফখর উদ্দীন বিন শফিউর রহমান বিন সৈয়্যদ হাসান মিয়াজি বিন নুরুদ্দীন। বাল্যকালে তাঁর শ্রদ্ধেয়া আম্মাজান মারা যান। মাতৃহারা এ শিশু তাঁর মুফতি পিতা শফিউর রহমান (রহঃ) ও তাঁর বড় ভাই মাওলানা মাহমুদুর রহমান (রহঃ) এর তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সহিত উত্তীর্ণ হন। ১৯৬০ সালে আলিম পরীক্ষায় ১ম বিভাগ, ১৯৬২ সালে ফাজিল পরীক্ষায় ১ম বিভাগ ৫ম স্থান, ১৯৬৪ সালে কামিল হাদীস পরীক্ষায় ১ম শ্রেণি ২য় স্থান, ১৯৬৬ সালে কামিল ফিকহ পরীক্ষায় ১ম শ্রেণিতে ১ম স্থান ১৯৬৭ সালে ডিপ্লোমা ইন-আদীব পরীক্ষায় ১ম শ্রেণিতে ১ম স্থান, ১৯৬৮ সালে ডিপ্লোমা ইন-আদীব-ই-কামিল পরীক্ষায় ১ম বিভাগে ১ম স্থান অধিকার করেন। তিনি ১৯৬৪-১৯৬৫ সালে মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা এর রিচার্স এন্ড পাবলিকেশন বিভাগ হতে সরকারি স্কলারশীফ নিয়ে আল্লামা আব্দুর রহমান কাশ-গড়ী (রহঃ) এর তত্ত্বাবধানে "ফোকাহায়ে ইষ্ট পাকিস্তান কে ফেকহী কারনামে” শীর্ষক অভিসন্দভের উপর গবেষণা করে রিচার্স স্কলারশীফ ডিগ্রী লাভকরেন। তিনি মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকায় অধ্যয়ন কালে মুফতি সৈয়দ আমীমুল ইহছান মুজাদ্দেদী (রহ:) থেকে ইলমী জাহেরী ও ইলমে বাতেনী হাসিল করেন। তিনি তাঁকে স্বীয় তরীকতের ওজীফা ও শাজরা শরীফ প্রদান করেন। মাওলানা ফখর উদ্দীন (রহ:) মুফতি সাহেবের নিকট হতে তাফসীর, হাদীস, ফিকাহ ও তরীকতের সনদ গ্রন্থ "মিন্নাতুল বারী” এর ইযাযত লাভ করেন। এতদ্ব্যতীত আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান বেরেলভী (রহ:) স্বীয় হাদীসের সনদগ্রন্থ "আল-ইযাযাতুল মতীনাহ লে ওলামায়ে বাক্কাতাহ মদীনাহ" স্বীয় শিষ্য ও খলীফা, আলেমকুল সম্রাট আল্লামা যুফর উদ্দীন বিহারী (রহ:) কে ইযাযাত দান করেন। তিনি ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার হেড মুহাদ্দিস মুফতি সৈয়দ আমীমুল ইহছান মুজাদ্দেদী (রহ:) কে উক্ত সনদগ্রন্থটি ইযাযাত দান করেন। তিনি স্বীয় শিষ্য ও খলীফা ঢাকা সরকারী আলিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা ফখর উদ্দীন (রহ:) কে এ সনদগ্রন্থটি ইযাযাত দান করেন। তিনি মুফতি সাহেবের পূণ্যময় হস্তে মুজাদ্দেদীয়া নকশবন্দীয়া ও কাদেরিয়া রেজভীয়া তরীকতের ইযাযাত লাভ করেন। অধ্যক্ষ মাওলানা ফখর উদ্দীন (রহ:) যাদের সান্নিধ্যে শিক্ষা জীবন অতিবহিত করেন তাদের মধ্যে অন্যতম শিক্ষকমন্ডলীগণ হচ্ছেন: ১. আল্লামা আব্দুর রহমান কাশগড়ী (রহ:) ২. মুফতি সৈয়্যদ মাওলানা আমীমুল ইহসান ইবনে সৈয়্যদ আব্দুল মান্নান মুজাদ্দেদী (রহঃ), ৩. শায়খ মাওলানা আব্দুস সাত্তার বুখারী (রহ), ৪. শায়খ মাওলানা ওবাইদুল হক মুহাদ্দিস সিলেটী (রহঃ), ৫. শায়খ মাওলানা আবুল হায়ের মুহাদ্দিস (রহঃ) এরা সবাই মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকায়। ৬. শায়খ মুফতি মাওলানা আমিনুল মুহাদ্দিস (রহঃ), ৭. মাওলানা ফোরকান মুহাদ্দিস (রহঃ), ৮. শায়খ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী মুহাদ্দিস (রহঃ) ৯.মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মোনায়েম (রহ:) এরা দারুল উলুম মাদরাসা (চট্টগ্রাম)'র শিক্ষক ছিলেন। ৩১ অক্টোবর ১৯৬৮ সালে মাওলানা ফখর উদ্দীন সাহেব (রহঃ) সরকারি সিলেট আলিয়া মাদরাসার মুদাররিস হিসেবে যোগদান করেন। এর পূর্বে তিনি কিছুদিন ছোবহানিয়া আলিয়া মাদরাসার মুহাদ্দিস হিসেবে কমর্রত ছিলেন। ০৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৭০ সালে মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকায় বদলী হন।১০ এপ্রিল ১৯৭৬ হতে ০৪ মে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত প্রভাষক (হাদীস বিভাগ) হিসেবে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা, ০৫ মে ১৯৭৯ সালে একই পদে পুনঃরায় মাদরাসা-ই আলিয়া ঢাকায় বদলী হন। ২২ আগস্ট ১৯৮৪ সালে সহকারী অধ্যাপক তাফসীর বিভাগ) হিসেবে মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকায় উন্নীত হন। ০৫ আগস্ট ১৯৮৯ সালে একই পদে সিলেট আলিয়া মাদরাসায় বদলী হন। ২০০০ সাল হতে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে সিলেট আলিয়া মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, ২২ জানুয়ারী ২০০২ সাল হতে ২০০৪ সাল পর্যন্ত উপাধ্যক্ষ এবং ২০০৪-২০০৬ সাল পর্যন্ত অধ্যক্ষ হিসেবে সুনাম ও দক্ষতার সহিত নিবিড়াভাবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকুরী হতে অবসর নেয়ার পর বেশ কিছু মাদ্রাসা থেকে তাঁর কাছে শিক্ষকতার অফার আসে। অবসর গ্রহণের দুই বছর আগে থেকেই চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসার সেক্রেটারি সাহেব সিলেট এসে তাঁকে তাদের প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার প্রস্তাব দেন। তাছাড়া সিলেটেও বেশ কয়েকটি মাদ্রাসায় প্রস্তাব দেন। চুনতীর এক দাওয়াতে তাঁর শ্রদ্ধেয়ভাজন ওস্তাদ পীরে কামেল শাহ হাবীব আহমদ (রহ:) এর অনুরোধে শেষ পর্যন্ত সকল প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে ইনতিকালের পূর্ব পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান চুনতী হাকীমিয়া আলিয়া মাদরাসার শায়খুল হাদীস হিসেবে বেসরকারিভাবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সাথে চুনতীর ১৯ দিন ব্যাপী সিরাতুন্নবী (সা) মাহফিলের উদ্ভোধক ছিলেন। এছাড়া তিনি ইনতিকালের পূর্ব পর্যন্ত স্থানীয় মুরব্বীদের অনুরোধে চন্দনাইশ "এয়াকুব মরিয়ম জামে মসজিদ" এর খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দারুল ইফতা শাখায় প্রধান মুফতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৩ সালে সিলেট জেলা হতে জাতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে সরকারের নিকট হতে পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। তিনি অসংখ্যবার বেসরকারীভাবে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন থেকে পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। এমনকি এই প্রথিতযশা আলেমেদ্বীনকে ১২ জানুয়ারী ২০১২ সালে চুনতি হাকীমিয়া আলিয়া মাদরাসার কামিল শ্রেণীতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিবিধ শাখা-প্রশাখায় আল্লামা ফখর উদ্দীন (রহ:) এর পদ চারণা ছিল রীতিমত বিস্ময়কর। জ্ঞান চর্চার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল আজন্ম। তিনি আমৃত্যু পর্যন্ত জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে কাটিয়েছন। তিনি সারা জীবন সব ক্ষেত্রে মহানবী (সাঃ) এর আদর্শ তথা কুরআন হাদীসের বিধান অনুসররণ করতেন এবং সবাইকে তা অনুসরণ করার উৎসাহিত করতেন। তিনি একজন উঁচু দরের হাদীস বিজ্ঞানী ছিলেন। সমগ্র জীবন হাদীস চর্চা ও হাদীসের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। ফিকাহ চর্চার প্রতি তাঁর অসীম অনুরাগ ছিল। তিনি কুরআন হাদীসের পাশাপাশি ফিকাহ শাস্ত্রেও অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি একজন ফিকাহবিদ ও মুফতি (ইসলামী আইনবিদ) ছিলেন। হানাফী ফিকাহ শাস্ত্রের ছাড়া অন্যান্য মাযহাবের ফিকাহ শাস্ত্রের খুঁটিনাটি বিষয়ে তাঁর অভূতপূর্ব প্রজ্ঞা ছিল। তিনি একজন সফল আরবীবিদ, শিক্ষাবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ছিলেন। কুরআন, হাদীস, তাফসীর, ফিকহ, উসুল, আরবী, উর্দু ও ফার্সি ইত্যাদি ইসলামী শিক্ষায় অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। ফরায়েজ শাস্ত্রেও তিনি অসাধারণ পান্ডিত্য ও অভিজ্ঞতার অর্জনে ব্রতী হন। উল্লেখ্য তাঁর ফতোয়া এত বলিষ্ঠ ও তথ্যপূর্ণ ছিল যে কেউ এর বিরুদ্ধচারণ করতে বিন্দুমাত্র সুযোগ পেতেন না। তিনি উত্তম আদর্শ ও অনুপম চরিত্রের অধিকারী সুমহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। নম্রতা ও বিনয়বনতা, দানশীলতা, তাকওয়া ও পরহেজগারী এবং আশেকানে রাসূল প্রভৃতি গুণাবলীতে তিনি ছিলেন অনন্য ও অসাধারণ। ব্যবহার ছিল অমায়িক, সুমধুর এবং নিরহংকার। কোন দিন তিনি বংশীয় ঐতিহ্য এবং ইলমের বাহাদুরী করতেন না। যে কেউ তাঁর সাথে যে কোন ধরনের কথা বলতে পারতেন, এতে তিনি বিন্দুমাত্র বিরক্তিবোধ করতেন না। তিনি সব সময় কুরআন, হাদীস, দালায়েলুল খায়েরাত ও দরুদ শরীফ পাঠে রত থাকতেন। তিনি বড়দের প্রতিযথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন এবং ছোটদের প্রতি স্নেহ করতেন। তিনি সত্য ভাষী, সহিষ্ণু, ধৈর্যশীল এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ছিলেন। লাজুকতায় তাঁর দৃষ্টি সব সময় নিম্নগামী হত। তিনি স্বীয় পিতার ন্যায় আচার ও অভ্যাসে আদর্শ নমুনা ছিলেন। তিনি রাসূল পাক (সাঃ) এর প্রতি গভীর ভালবাসা এবং গাউসুল আযম হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) সহ অন্যান্য অলীয়ে কেরাম গণের প্রতি ভক্তি এবং শ্রদ্ধা তাঁর জীবনের উন্নত ভূষন। ইসলাম ও শরীয়তের সুরক্ষায় এবং রাসূল পাক (সাঃ) এর মান সম্মান সমুন্নতা রাখার ব্যাপারে আল্লামা ফখর উদ্দীন (রহঃ) সব সময় নির্ভীক ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইসলামী আইন চর্চার ও সত্য প্রতিষ্ঠায় অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন। তিনি অতিথি পরায়ন ছিলেন। অসংখ্য লোক তার সাথে সাক্ষাতের জন্য এবং বিভিন্ন মাসআলা সম্পর্কে জানার জন্য আগমন করতেন। তিনি তাদেরকে বিনা মেহমানদারীতে ফিরিয়ে দিতেন না। কারো উপহার লাভের লোভ তাঁর মধ্যে ছিল না। তিনি অত্যন্ত স্বল্পহারী ছিলেন। তবে সামান্য মুখরোচক খাবার তিনি পছন্দ করতেন। তিনি কোনদিনই তার পরিমাণের বেশী খেতেন না। তবে, চা এক কাপ বেশী দিলে তিনি সাধারণত তা না করতেন না। তিনি মাত্রা অনুযায়ী পানও খেতেন। তাঁর চলাফেরা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। জাঁকজমকপূর্ণ মূল্যবান বস্ত্র তিনি কখনো পরিধান করতেন না। তাঁর ব্যবহার্য বস্ত্রাদি তিনি নিজেই ধুতেন। নিজের কাজ নিজেই করতেন। তাঁর সন্তান-সন্ততি থাকা সত্ত্বেও নিজেই বাজারে গিয়ে পরিবারের জন্য বাজার করে নিয়ে আসতেন। আরাম ও বিলাসিতাকে তিনি ঘৃণা করতেন। তিনি সব সময় সুগন্ধী (আতর) ব্যবহার করতেন। সাহবায়ে কেরামের আড়ম্বরহীন সহজ সরল জীবনই তাঁর অত্যন্ত পছন্দের ছিল এবং তাঁদের অনুসরণ করেই তিনি জীবন অতিবাহিত করার চেষ্টা করতেন। তিনি গৃহস্থালী কাজেও অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তিনি জমির আগাছা পরিষ্কার, বীজক্ষেত তৈরী, নানা ফল গাছ চারা রোপণ ও পরিচর্যা, সার দেয়া, গ্রামে ঘরের চারপাশে সীমানা দেয়া, মহিলাদের গোসলের ব্যবস্থার জন্য নিজেই জল ঘাট নির্মাণ সহ ইত্যাদি কাজ অত্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতেন। এসব কাজে তিনি অত্যন্ত আনন্দ পেতেন এবং পরিবারকেও এসব কাজ করার উৎসাহ যোগাতেন। প্রফেসর আল্লামা ফখর উদ্দীন (রহঃ) খুব সাহসী ছিলেন। রাজনৈতিক দোলাচালকে ডরাতেন না তিনি। তিনি রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত কিংবা দলীয় রাজনীতিবিদ ছিলেন না। কিন্ত রাজনীতিতে তাঁর জ্ঞান ছিল প্রখর ও বাস্তবভিত্তিক। যে ছাত্রটা পরীক্ষায় পাশ করতে পারে না, ভালো করে বাংলা লিখতে পারে না, আরবি জানে না, ইংরেজী জানে না তাকে দেওয়া হয় একটা বড় সংগঠনের জাতীয় দায়িত্ব। এটা একটা রাজনীতি ও জাতির পংগুত্বের লক্ষণ। যে রাজনীতিতে নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বুদ্ধি, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও মেধার চেয়ে চিরাচরিত রীতিবদ্ধতা, আনুষ্ঠানিকতা ও অন্ধ আনুগত্যকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয় সে রাজনীতি কোনদিন কল্যাণ বয়ে আনে না। কারণ আদর্শ মানে পুরানোকে অন্ধভাবে মানা নয়, আদর্শ মানে নতুনকে নতুন রেখেই পুরানোর স্পিরিট অনুযায়ী চলা ও চালানো। তিনি রাজনীতি ও ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে এমনই ভাবতেন। তাঁর একটা ছোট্ট রেডিও ছিলো। তিনি রেডিওতে খবর শুনতেন। নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা পড়তেন এবং রাজনীতির অত্যন্ত খুটিনাটি বিষয়েও খোঁজ-খবর রাখতেন। শায়খুল হাদীস আল্লামা ফখর উদ্দীন (রহ:) একজন ব্যাক্তি নন। বরং তিনি একাই একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি একটি আনজুমান, একটি একাডেমী, একটি গবেষণা ইনষ্টিটিউটও বঠে। এই আলেমে দ্বীন একজন বিশিষ্ট সমাজ সেবক, সমাজ সংস্কারের অন্যতম পুরোধা, শরীয়ত বিরোধী ও অনৈসলামিক কার্যকলাপ উচ্ছেদ আন্দোলনের আপোষহীন প্রবক্তা, সত্যনিষ্ঠা এবং বাতিল মতাবাদের আতংক ছিলেন। এমন কি তিনি একজন সংগঠকও বঠে। মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের নেতৃত্বে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা প্রাক্তন ছাত্র সমিতি গঠনের পেছনে তাঁর অনেক চেষ্টা ও অবদান ছিলো। আলিয়া মাদ্রাসার সমস্যা নিয়ে জাতীয় পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট করানোর জন্যেও তিনি বিভিন্ন সূত্রে অনেক কাজ করেছিলেন। শায়খ আল্লামা ফখরুদ্দীন (রহ) ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার হাল-নাগাদ তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করতেন। ছাত্রাবাসের সমস্যা সমাধানের জন্যে তার অক্লান্ত চেষ্টা ও প্লান একটা ইতিহাস হয়ে আছে। তার এই সাহসী পদক্ষেপ তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। আলীয়া মাদ্রাসায় মেধার ভিত্তিতে সীট দেয়া মানে অছাত্রদের সীট কমে যাওয়া। আর তাদের বের হয়ে যাওয়া। এটা ঐ সংগঠন গুলো মেনে নিতে পারেনি। ফলে তারা শায়খের উপর ভীষণ ক্ষেপে যায়। এর সাথে যুক্ত হয় আরো কিছু উস্তাযদের নোংরা রাজনীতি। ফখরুদ্দীন সাহেবের কাছেই থাকে ছাত্রদের ভীড়, তার কাছে ব্যাচে পড়ে প্রায় শতেকের উপর ছাত্র। ইনকাম হতো সেই সময়ে যে কোন ভালো চাকুরিজীবীর চেয়ে ঢের গুণ। কাজেই রোষ, ক্ষোভ, হিংসা ও বিদ্বেষের শিকার হয়ে পড়েন এই অকুতোভয় শায়খুল হাদীস। তিনি কারো সাথে কম্প্রোমাইজ করেন নি, কোন রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করেননি, রাতের আঁধারে কারো কাছে সাহায্য চান নি, যা ই করতেন তা জায়নামাজে দাঁড়িয়ে, বসে বা সাজাদাতেই করতেন। মাদ্রাসা-ই-আলিয়া সিলেটে কমর্রত থাকাবস্থায় তিনি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযান, নকল ও সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান, বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন, জাতীয় ঠিকাদান কর্মসূচি, বিনামূল্য শিক্ষা উপকরণ বিতরন, রক্ত দান কর্মসূচি সহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যে অংশ গ্রহণ করেন। এমনকি এই আলেমেদ্বীন সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার রোভার স্কাউটের উপদেষ্টা সহ বিভিন্ন সামাজিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্ব পূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭২ সালের ১৮ জুন লোহাগাড়া থানার চুনতীর বড় মৌলভীর বাড়ী মাওলানা আব্দুল হাকীমের বংশধর মাওলানা আব্দুন নূর সিদ্দিকীর ১ম কন্যা ফাতেমা বতুলসিদ্দিকার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর শ্বশুর একজন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন এবং অলীয়ে কামেল ছিলেন। তিনি সাবেক অধ্যক্ষ বাজালিয়া হেদায়াতুল ইসলাম সিনিয়ার মাদ্রাসা ও হুলাইন ইয়াছিন আউলিয়া সিনিয়ার মাদ্রাসায় সুনাম ও দক্ষতার সহিত নিবিড়ভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চুনতী হাকীমিয়া আলীয়া মাদ্রাসায় ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত মুহাদ্দিস এবং পদুয়া হেমায়াতুল ইসলাম সিনিয়ার মাদ্রাসা (আল জামেউল আনওয়ার)'য় সাবেক মুহাদ্দিস ছিলেন।